নিজস্ব প্রতিবেদক গাইবান্ধা:
গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ যেন থামছেই না। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার দপ্তর থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ ছাড়ের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের কমিশন নেওয়ার একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ—এই কমিশন বাণিজ্যের প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান এমনকি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থও।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথি, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এমন বেশ কিছু প্রকল্পের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প এলাকায় পুরো অর্থ পৌঁছেনি। কোথাও বরাদ্দের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ, কোথাও অর্ধেকেরও কম অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্পের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
‘৫০ শতাংশ কমিশন ছাড়া প্রকল্প হয় না’—অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের
অনুসন্ধানে কথা হয় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধির সঙ্গে। তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, পিআইও কার্যালয়ে প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে কমিশনের দাবি করা হয়।
লক্ষীপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন প্রকল্পে তাকে অর্ধেক অর্থ দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প দেওয়া হয়েছিল।
তার ভাষায়, “পিআইও সাহেব অর্ধেকের শর্ত দিয়েই প্রকল্পটি দিয়েছেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, মসজিদে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। বাকি অর্থ কোথায় গেছে—এ প্রশ্নে তিনি পিআইও কার্যালয়ের দিকে ইঙ্গিত করেন।
অভিযোগের বিষয়ে পিআইও রিয়াজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দায় সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীর দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
দুই লাখ টাকার মসজিদ প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার
২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল দুই লাখ টাকা।
কিন্তু অনুসন্ধানে মসজিদ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদ কর্তৃপক্ষ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা।
মসজিদের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জানান, ওই অর্থবছরে মসজিদের জন্য সরকারি কোনো অর্থ পাওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না।
প্রকল্পের সভাপতি ও মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার বলেন, তিনি প্রকল্প কমিটির সভাপতি হলেও প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বিষয়টি ‘সারোয়ার ভাই’ দেখতেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্প পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সারোয়ার গিদারী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য জরিফুল বেগমের স্বামী।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মসজিদকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন সারোয়ার। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।
বাকি অর্থের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্য ছিল, “পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়। আমি এটি কিনে নিয়েছি।”
এই বক্তব্য সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দুই লাখ টাকার কবরস্থান প্রকল্প—অর্থই পায়নি কবরস্থান
২০২৪-২৫ অর্থবছরের কাবিটা দ্বিতীয় পর্যায়ে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর উত্তরপাড়া কবরস্থান সংস্কার’ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই লাখ টাকা।
কিন্তু কবরস্থান সংশ্লিষ্টদের দাবি, তারা কোনো সরকারি অর্থ পাননি। এমনকি প্রকল্পটির বিষয়েও তাদের অনেকের জানা ছিল না।
কবরস্থান রক্ষণাবেক্ষণকারী নজরুল ইসলাম বলেন, তারা কোনো সরকারি অর্থ পাননি।
হারুণ মিয়া বলেন, বরাদ্দের অর্থ পাওয়া গেলে কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা সম্ভব হতো। তিনি বরাদ্দের অর্থ উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সাড়ে পাঁচ টন গমের প্রকল্প, বাস্তবে নেই সেই ‘রাস্তা’!
একই অর্থবছরের কাবিখা তৃতীয় পর্যায়ে ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পে প্রায় ৫ দশমিক ৩৪৩ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই প্রকল্পের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে কোনো রাস্তা নেই; কয়েকটি পরিবারের বাড়ির উঠানকে রাস্তা দেখিয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, এখানে কোনো রাস্তা নেই এবং কোনো কাজও হয়নি।
প্রকল্প সভাপতি ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম প্রথমে ইটের কাজ করার দাবি করলেও পরে বলেন, প্রকল্পটি অনেকদিন আগের—দেখে বলতে হবে কোন প্রকল্প।
৫২ হাজার টাকার মন্দিরে পৌঁছেছে ২৬ হাজার
২০২৩-২৪ অর্থবছরের টিআর প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাদিয়াখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫২ হাজার টাকা।
মন্দির পরিচালনা কমিটির দাবি, তারা পেয়েছে মাত্র ২৬ হাজার টাকা।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, প্রথম দফায় ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে বাকি টাকা চাইতে পিআইও অফিসে গেলে জানানো হয়, আর টাকা নেই।
প্রকল্প সভাপতি ও মন্দিরের পুরোহিত নিকুঞ্জ কুমারশীল (দয়াল)ও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
৭২ হাজার টাকার মসজিদ প্রকল্পে পাওয়া গেছে ৩৫ হাজার
একই অর্থবছরে লক্ষীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন’ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৭২ হাজার টাকা।
কিন্তু মসজিদ কমিটির দাবি, তারা পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা।
মসজিদের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা তাদের জানানো হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোস্তফা মেম্বার তিন দফায় ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন।
প্রকল্প সভাপতি জাকিরুল ইসলাম বলেন, তার কাছ থেকে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।
ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বাকি টাকা পিআইও কার্যালয়ের।
তিনি অভিযোগ করেন, পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প পাওয়া যায় না।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও কমিশন—জনমনে প্রশ্ন
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ মূলত জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা। বিশেষ করে মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান কিংবা এতিমদের মতো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ অর্থও যদি কমিশন বা ভাগ-বাটোয়ারার নামে কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়—জনগণের আস্থার ওপরও বড় আঘাত।
অনুসন্ধানে পাওয়া এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রকল্পভিত্তিক হিসাব নিরীক্ষা করা হলে সরকারি অর্থের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
নাটের গুরু’ কে?
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলা পিআইও কার্যালয়ে প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প কমিটি গঠন, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে একটি সমন্বিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের নেতৃত্বে পিআইও রিয়াজুল ইসলাম রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পিআইও রিয়াজুল ইসলাম সরাসরি দায় স্বীকার করেননি। বরং তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কয়েকটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীর দিকে দায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাট বা আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই। এমন ঘটনা হয়ে থাকলে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য বের করতে
টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থানের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ অর্থের বড় অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে না পৌঁছানোর অভিযোগ বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, প্রকল্প কমিটির ব্যাংক হিসাব, চেক, বিল-ভাউচার, মাস্টাররোল, কাজের পরিমাপ, প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গত দুই অর্থবছরে গাইবান্ধা সদরসহ জেলার সাত উপজেলার টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিয়ে সমন্বিত তদন্ত হলে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।