২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে চালানো অভিযানে ৫৮ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে।

রোববার (১১ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে এবং আগামী ৭ জুন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য রয়েছে।

তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিহতের সংখ্যা ও এলাকা: তদন্ত সংস্থা এখন পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে ৫ মে দিবাগত রাতে ঢাকার শাপলা চত্বর এলাকায় ৩২ জন, ৬ মে নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় ১ জন নিহত হন।

পরিকল্পিত অপরাধ (Systematic Crime): প্রসিকিউশন এই ঘটনাকে একটি ‘সিস্টেম্যাটিক ক্রাইম’ বা পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে দেখছে। তৎকালীন সরকারপ্রধানের সরাসরি নির্দেশে ও পরিকল্পনায় এই অভিযান চালানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

আসামিদের তালিকা: মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এবং বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ প্রায় ৩১ জনকে আসামি করা হচ্ছে।

রাজসাক্ষী: চাঞ্চল্যকর এই মামলায় পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

তদন্তে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, একাত্তর টিভিতে প্রচারিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ কারণে আগামী ১৪ মে দীপু মনিসহ উল্লিখিত তিনজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়া আলেম-ওলামাদের ওপর গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হলেও মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ শুরু থেকেই ৬১ জনের নিহতের তালিকা প্রকাশ করে আসছিল। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে নতুন গতি সঞ্চার হয়।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। প্রসিকিউশন আশা করছে, এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চাপা পড়ে থাকা সত্যটি জাতির সামনে উন্মোচিত হবে।