তালাত মাহামুদ | বিশেষ প্রতিনিধি, নরসিংদী
বাংলাদেশ বহুধর্ম, বহুমত ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দেশ। এ দেশের লোকসংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক চর্চা, মাজার, খানকা শরিফ, দরবার ও বিভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একটি শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি ধর্মীয় আবেগ ও ‘তাওহীদি জনতা’র নাম ব্যবহার করে মব সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সংস্কৃতিপ্রেমী ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন যেমন প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারও বক্তব্য, কর্মকাণ্ড বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা নিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অভিযোগ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধানের পথ অনুসরণ করাই সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম। কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা, হামলা করা, কোনো স্থাপনায় দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করা কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই।
বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন মাজার, খানকা শরিফ, দরবার ও আধ্যাত্মিক আস্থানা ঘিরে মব সৃষ্টির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় বা কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করে যারা ব্যক্তিস্বার্থ, প্রতিহিংসা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জনতাকে উসকে দিচ্ছে, তাদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; দেশের সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই কোনো গোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় দেখে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে মব সৃষ্টি, সহিংসতা, ভাঙচুর, হুমকি ও উসকানির সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান—ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান রেখে একই সঙ্গে নাগরিকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মের নাম ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের শক্তি তার বৈচিত্র্য, সহাবস্থান ও সম্প্রীতিতে। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে যদি আইন ভঙ্গ, মব সৃষ্টি ও সহিংসতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত প্রতিফলন হতে পারে না। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।