গভীর রাতে নিজ বসতঘরে ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। হঠাৎ দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার শব্দ। কোনো আইনি পরোয়ানা কিংবা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, কাউকে বিছানা থেকে সরাসরি তুলে নিয়ে যাওয়া হয়; আবার অন্য একজনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থানা হেফাজতে। অথচ কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশের আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও নথিতে দাবি করা হয়—তারা নাকি দেশীয় ও আধুনিক অস্ত্রসহ ব্রিজের ওপর সমবেত হয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানা পুলিশের সম্প্রতি পরিচালিত তথাকথিত এক ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযান ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কথিত এই ডাকাতি অভিযানের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে জব্দকৃত মাদক বিক্রির পাওনা টাকা আদায়ের টানাপোড়েন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অস্ত্র কেনা এবং খোদ থানা পুলিশের এক সিএনজি চালকের ছকে সাজানো এক অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য।আলামতের চাইনিজ কুড়াল: ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে উদ্ধার টেবিলপুলিশের প্রেস ব্রিফিং ও আলামত প্রদর্শনীর ছবিতে যে দুটি আধুনিক কালো ‘ট্যাকটিক্যাল চাইনিজ কুড়াল’ (টমাহক ও ডাবল ব্লেড এক্স) প্রদর্শন করা হয়েছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে মেলে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য।

অপরাধীদের ব্যবহৃত প্রথাগত দেশীয় অস্ত্রের তালিকায় সচরাচর যেসব কামারশালায় তৈরি অস্ত্র দেখা যায়, জব্দ দেখানো অস্ত্রগুলো ছিল তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন—ব্র্যান্ড-নিউ ও আধুনিক ট্যাকটিক্যাল মিলিটারি গিয়ার।

ডিজিটাল অনুসন্ধান ও আলামতের ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশের জব্দ তালিকায় দেখানো কুড়াল দুটি হুবহু একটি নির্দিষ্ট অনলাইন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের (FineNpick.com) ‘ট্যাকটিক্যাল ডাবল ব্লেড এক্স’ এবং ‘ট্যাকটিক্যাল টমাহক এক্স’-এর সাথে শতভাগ মিলে যায়।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও গোপন সূত্রের দাবি:পুলিশের প্রদর্শিত আলামতের এই কুড়ালগুলো কথিত অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি; বরং অভিযানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করতে আগেই অনলাইন থেকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয়েছিল।

এই অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থাপনার সাথে কসবা থানা পুলিশের নিয়মিত সিএনজি চালক সোহরাব এবং কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) তথাকথিত হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত মোঃ রাশেদ পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।মাদকের টাকা আদায় না হওয়ায় ‘ডাকাতির’ চিত্রনাট্যঅনুসন্ধানের গভীরে গিয়ে জানা যায়, পুরো নাটকীয় ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি পূর্ববর্তী মাদকবিরোধী অভিযান ও তার পরবর্তী আর্থিক অনিয়ম থেকে।নির্ভরযোগ্য অভ্যন্তরীণ সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী:মাদকের চালান বিক্রি: কসবা থানার এসআই নূর-নবী পরিচালিত একটি মাদকবিরোধী অভিযানে কিছু অবৈধ মাদক জব্দ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, জব্দকৃত সেই মাদকের একটি অংশ আইনি প্রক্রিয়ায় নথিভুক্ত না করে সিএনজি চালক সোহরাবের মধ্যস্থতায় স্থানীয় মাদক কারবারি শান্তার কাছে বিক্রির জন্য দেওয়া হয়।টাকা নিয়ে জটিলতা: শান্তা সেই মাদকের চালান জুনায়েদ মিয়া নামক এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। তবে জুনায়েদ সেই মাদকের মূল্য পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা শুরু করে এবং একপর্যায়ে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।আটকে যাওয়া লেনদেন: জুনায়েদ টাকা পরিশোধ না করায় শান্তা সেই অর্থ চালক সোহরাবকে দিতে পারেনি।

এর ফলে সোহরাবও এসআই নূর-নবীর কাছে মাদকের বিক্রয়লব্ধ টাকা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়।দীর্ঘদিন এই পাওনা টাকা নিয়ে টানাপোড়েন চলার পর, এসআই নূর-নবীর চাপ সামলাতে ও পাওনা টাকা আদায়ের বিকল্প পথ তৈরি করতে নিজেই ছক কষে সিএনজি চালক সোহরাব। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সোহরাবের পরামর্শ ও ছক অনুযায়ীই এসআই নূর-নবী ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এই সাজানো ‘ডাকাতি প্রস্তুতি’ মামলার পরিকল্পনা করেন।পুরোনো আসামিদের বলির পাঁঠা বানানোর কৌশলসাজানো অভিযানটিকে আইনি ও সামাজিকভাবে প্রশ্নাতীত করতে অত্যন্ত ধূর্ত কৌশল বেছে নেওয়া হয়। চালক সোহরাব ও সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা ছিল—এমন ব্যক্তিদের এই মামলায় জড়াতে হবে, যাদের অতীতে অপরাধ বা মামলার রেকর্ড রয়েছে।এর মূল লক্ষ্য ছিল দুটি:মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা: পূর্বে মামলার রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত দেখালে আদালত ও জনসাধারণের কাছে ঘটনাটি খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে।

সহানুভূতি রোধ করা: আসামিরা আগে থেকেই পুলিশের নজরে থাকায় স্থানীয় সচেতন মহল বা মানবাধিকারকর্মীরা তাদের আটকের প্রক্রিয়া নিয়ে সহজে কোনো প্রশ্ন তুলবেন না কিংবা তাদের প্রতি কোনো সামাজিক সহানুভূতি তৈরি হবে না।এই পূর্বপরিকল্পনা মাফিকই রাতে বাড়ি থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় এবং অন্যান্য স্থান থেকে তুলে এনে শেষ পর্যন্ত ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় বলে ভুক্তভোগীদের স্বজনরা সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছেন।দায়িত্বশীলদের নীরবতা ও ব্ল্যাক লেন্সকে হুমকির অভিযোগএসব গুরুতর অভিযোগ, আলামতের অসঙ্গতি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কসবা থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদ, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল আমীন এবং সংশ্লিষ্ট অভিযানের এসআই নূর-নবীর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউই সাড়া দেননি এবং কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেননি।বরং ঘটনার তথ্য উদ্ঘাটন ও সত্য প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় সিএনজি চালক সোহরাবের মাধ্যমে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ব্ল্যাক লেন্স’ (Black Lens)-কে এ বিষয়ে অনুসন্ধান বন্ধ রাখতে এবং সম্পূর্ণ চুপ থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ বার্তা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবহীনতা এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে দমিয়ে রাখার এই অপচেষ্টা পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তুলেছে।প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিআইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি নিয়মিত অভিযান যেখানে তথ্য ও আইনি বিধিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেখানে একজন সিএনজি চালকের ব্যক্তিগত বিরোধ ও মাদক বিক্রির টাকা আদায়ের ছকে পুরো একটি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করার অভিযোগ আইনের শাসনের ওপর চরম আঘাত।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি—অনলাইন থেকে অস্ত্র ক্রয়ের পেমেন্ট ও ডেলিভারি হিস্ট্রি, সংশ্লিষ্ট তারিখের কসবা থানার অভ্যন্তরীণ ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে পুরো ঘটনার নেপথ্যের সত্য উদ্ঘাটিত হবে। ব্যক্তিগত বিরোধ মেটাতে এবং সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতে ক্ষমতার এমন অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ ও পুলিশ সদর দপ্তরের জরুরি ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করা আবশ্যক।