কাজী আশরাফুল আলম গাজীপুর:

গাজীপুরসহ সারা দেশে অপসাংবাদিকতার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, নিরীহ মানুষকে হয়রানি এবং সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ উঠছে কিছু নামসর্বস্ব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। তাদের কথিত দৌরাত্ম্যে একদিকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে পেশাদার ও প্রকৃত সাংবাদিকেরা পড়ছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। এতে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

সাংবাদিকতা হচ্ছে সমাজের অসংগতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সেই পেশার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তা শুধু সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী নয়, বরং পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য উদ্বেগজনক।

গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবাধ বিচরণের অভিযোগ

গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়াসহ শিল্পাঞ্চল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নামসর্বস্ব সাংবাদিক পরিচয়ধারীদের বিচরণ নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো, আবার কারও বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। সাংবাদিক পরিচয়ধারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে একইভাবে বিবেচনা না করে, যারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতার মর্যাদা

সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি করা কিংবা সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার মূল চেতনার পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে কেউ কেউ সামাজিক সম্মানহানি, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপের মুখে পড়তে পারেন।

অন্যদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অপসাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাংবাদিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। ফলে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

নামসর্বস্ব পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ, নাকি পেশার অপব্যবহার?

সচেতন মহলের মতে, সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র বা কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করলেই কেউ পেশাগত নৈতিকতার ঊর্ধ্বে চলে যান না। সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভুয়া পরিচয়ধারীদের চিহ্নিত করা এবং সাংবাদিকতার নামে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। সদস্যপদ প্রদান, পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত আচরণবিধি অনুসরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা জরুরি

সচেতন মহলের দাবি, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, নাগরিক প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে হবে। তবে কাউকে কেবল সাংবাদিক পরিচয় বা মতপার্থক্যের কারণে হয়রানি করা যাবে না। অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রমাণ, নিরপেক্ষতা এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও বাড়তে পারে

সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা অবৈধ সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার নয়। এটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সত্য উদ্‌ঘাটন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এই পেশার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার দায়ভার পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানো উচিত নয়।

গাজীপুরসহ সারা দেশে সাংবাদিকতার নামে অপতৎপরতার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যথায়, সাংবাদিকতার পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা ও জনআস্থা। তাই অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।