1. admin@nagorikchitra.com : admin :
August 12, 2026, 11:28 am
শিরোনামঃ
৩ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে পবিপ্রবি’র রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য মনোনয়ন দিলেন চ্যান্সেলর পবিপ্রবির বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার। মদনে সহকারী শিক্ষিকা লাঞ্ছিত প্রধান শিক্ষকের হাতে,থানায় অভিযোগ শিবির ও জামায়াত নেতার কবর জিয়ারতে কাঁদলেন ডা. শফিকুর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০ বোতল এসকাফ সিরাপসহ গ্রেপ্তার ৩ ‎রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে ‎বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে সরকার প্রস্তুত ‎ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের শেখ কামরুল হাসান সাহার অভিনন্দন যুবসমাজকে রক্ষায় টঙ্গীতে মাদকবিরোধী সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৭ হাজার ৩ কোটি টাকার ৫ প্রকল্প অনুমোদন, সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাঙালির মুক্তির সনদ: স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার মহাকাব্য ‘ছয় দফা’

বিশেষ প্রতিবেদন
  • Update Time : Sunday, June 7, 2026,

বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ জুন একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ছয় দফা দাবির পক্ষে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া গর্জে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে। পুলিশের নির্মম বুলেট উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিল মুক্তিকামী মানুষ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ আর টঙ্গীর পিচঢালা পথ। আজ সেই ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা দিবস’।

ঐতিহাসিকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত এই ছয় দফা দাবি কেবল রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়া এক জাদুকরী ইশতেহার। আর সে কারণেই এই ছয় দফাকে চিরকালের জন্য আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ বা ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে।

লাহোর থেকে স্বাধিকারের প্রথম স্ফুলিঙ্গ
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের লাহোরে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকা হয়। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার শোষিত-বঞ্চিত জনগণের পক্ষে দূরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তিনি উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি।

কী ছিল সেই ৬ দফায়?
এই দাবির মূল সুরই ছিল স্বায়ত্তশাসন। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণের অধিকার। দফাগুলোর মূল বক্তব্য ছিল:

শাসনতান্ত্রিক কাঠামো: প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় ছাড়া অন্য সকল ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে।

মুদ্রা ব্যবস্থা: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজ বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে।

কর ও রাজস্ব: কর, শুল্ক ধার্য ও আদায় করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে।

বৈদেশিক বাণিজ্য: দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব থাকবে।

আঞ্চলিক সংহতি: পূর্ব বাংলার প্রতিরক্ষা ঝুঁকি কমাতে এখানে আধা-সামরিক বাহিনী গঠন ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে।

৭ জুনের রক্তঝরা হরতাল ও গণজাগরণ
লাহোর থেকে দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু বসে থাকেননি। তিনি দেশব্যাপী তীব্র প্রচারাভিযান শুরু করেন। বাংলার আনাচে-কানাচে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন ৬ দফার প্রয়োজনীয়তা। অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের ভোটাধিকার, আলাদা মুদ্রা ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের এই দাবি আপামর জনতার নিজস্ব দাবিতে পরিণত হয়।

এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন সমগ্র বাংলায় আওয়ামী লীগের ডাকে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার এই আন্দোলন দমাতে লেলিয়ে দেয় পুলিশ ও ইপিআর। টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। রাজপথে শহীদ হন মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি। গ্রেপ্তার হন অসংখ্য নেতাকর্মী। কিন্তু রক্তের বিনিময়ে সূচনা হয় এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের, যা আর দমানো যায়নি।

ষড়যন্ত্র, আগরতলা মামলা ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান
ছয় দফার এই জোয়ার দেখে কেঁপে উঠেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত। আন্দোলন স্তব্ধ করতে তারা মেতে ওঠে একের পর এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে। বঙ্গবন্ধুকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, দেওয়া হয় অসংখ্য মামলা।

সদ্যপ্রয়াত বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ তাঁর এক স্মৃতিকথামূলক নিবন্ধে লিখেছিলেন:

“ছয় দফাকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বহু ষড়যন্ত্র করেছে। তারপরও যখন ছয় দফা আন্দোলন রোধ করা যাচ্ছিল না, তখন বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে চিরতরে তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা মামলা দেন।”

কিন্তু হিতে বিপরীত হয়। তোফায়েল আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ছাত্রনেতারা এই ছয় দফাকে নিজেদের ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, কলে-কারখানায় ছড়িয়ে দেন। সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, যার মুখে আইয়ুব খানের তখত-ই-তাউস ভেঙে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হন।

ছয় দফা থেকে এক দফা: স্বাধীন বাংলাদেশ
যে ছয় দফা শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে, পাকিস্তানি জান্তার দমনপীড়নের কারণে তা-ই পরবর্তীতে রূপ নেয় বাঙালির স্বাধীনতার এক দফায়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে এই ছয় দফার পক্ষেই বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগকে বিশাল ম্যান্ডেট দেয়। আর তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয় সেইসব শহীদদের, যাঁদের বুকের রক্তে লেখা হয়েছিল বাঙালির মুক্তির প্রথম সনদ। ৭ জুন কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বাধিকারের এক অবিনাশী বাতিঘর।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো খবর দেখুন
© All rights reserved © 2025
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: BDiT