ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ যুগের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হলো নতুন এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ উসকানি ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তনের’ লক্ষ্য নিয়ে একতরফা হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কংগ্রেস বা জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই শুরু হওয়া এই যুদ্ধের আইনি ভিত্তি নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রশ্ন উঠেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলাকালীন এই আকস্মিক হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার প্রথম দফা হামলার পর রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, এই অভিযানের লক্ষ্য কেবল তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনা নয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনী বা আইআরজিসি আত্মসমর্পণ না করলে তাদের সমূলে বিনাশ করা হবে। একই সঙ্গে ধ্বংস করা হবে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও নৌবাহিনীকে। ভাষণে তিনি পার্সিয়ান, কুর্দি, আজেরি ও বালুচসহ ইরানের সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের সুর মেলাতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে ‘সন্ত্রাসী শাসনগোষ্ঠী থেকে সৃষ্ট অস্তিত্বের হুমকি দূর করার যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমান সময়ে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেহরান তাৎক্ষণিক কোনো বড় হুমকি ছিল না। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে। নিজ দেশে জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় এবং জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়ায় ভোটারদের মনোযোগ ঘোরাতে ট্রাম্প এই যুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি নিজের প্রিয় ‘শুল্ক’ আরোপের ক্ষমতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খাওয়াও তাকে ক্ষুব্ধ করেছে।
সাবেক বাণিজ্যসচিব উইলবার রসের মতে, আদালতে এই পরাজয় ট্রাম্পের ইগোতে আঘাত করেছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই হামলায়। এছাড়া কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের নথিপত্র প্রকাশ নিয়ে চলা বিতর্ক থেকে দৃষ্টি সরাতেও যুদ্ধের ডামাডোল সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১০ দিন আগে ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ‘শান্তি পর্ষদ’-এর উদ্বোধন করেছিলেন, যেখানে টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা ট্রাম্পকে ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। অথচ ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প এখন সেই একই পথে হাঁটছেন। সে সময় ইরাকে যে ধরনের অজুহাত দেওয়া হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রায় একই ধরনের ঢালাও মন্তব্য করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও গত প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে ইরানকে সম্ভবত এখনই সবচেয়ে কম শক্তিশালী হিসেবে দেখা যায়, কারণ অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় দেশটি এমনিতেই বিপর্যস্ত।
ইতিহাস সাক্ষী, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব। এখন তেহরান সরকারের কাছে এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা তাদের হাতে থাকা সবটুকু শক্তি দিয়ে আক্রমণকারীদের সর্বোচ্চ ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক শুমার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ট্রাম্প যখন ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিপদে পড়েন তখন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ইরানের ওপর এই অতর্কিত হামলা সেই হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতারই ফল হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।