তালাত মাহামুদ | বিশেষ প্রতিনিধি, নরসিংদী
বাংলাদেশের রেলপথে যাত্রী নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কবচ ৪.০’ চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ট্রেন চলাচলের সময় সিগন্যাল অমান্য, অতিরিক্ত গতি ও সম্ভাব্য সংঘর্ষের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমানো।
‘কবচ’ ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি Automatic Train Protection (ATP) ব্যবস্থা। ভারতীয় রেলওয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে লোকোমোটিভ চালক নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় ব্রেক প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক প্রয়োগ করতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত গতিসীমা বজায় রাখতে সহায়তা এবং ঘন কুয়াশার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিরাপদ ট্রেন পরিচালনায় সহায়তা করে।
কবচ ৪.০-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো Signal Passed at Danger (SPAD) অর্থাৎ বিপজ্জনক অবস্থায় লাল সিগন্যাল অতিক্রমের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। পাশাপাশি ট্রেনের গতি, অবস্থান ও চলাচলের অনুমোদন সম্পর্কে উন্নত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে চালককে সহায়তা করা হয়। সংস্করণ ৪.০-এ অবস্থান নির্ণয়ের নির্ভুলতা বৃদ্ধি, ইয়ার্ডের সিগন্যাল-সংক্রান্ত তথ্য উন্নত করা এবং ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিংয়ের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মতো সুবিধাও যুক্ত হয়েছে।
এ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু চালকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর তৈরি করা। কোনো ট্রেন নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি গতিতে চললে বা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সিস্টেম সতর্কতা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক প্রয়োগ করতে পারে। ফলে চালকের মানবিক ভুলের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে কবচ ৪.০ বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয় ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। ভারতের সরকারি হিসাবে ট্র্যাকসাইড ও স্টেশন-সংক্রান্ত কবচ স্থাপনে আনুমানিক প্রতি কিলোমিটারে ৫০ লাখ ভারতীয় রুপি এবং লোকোমোটিভে সরঞ্জাম স্থাপনে প্রায় ৮০ লাখ রুপি ব্যয় হয়। এর পাশাপাশি অপটিক্যাল ফাইবার, টেলিকম অবকাঠামো, স্টেশন সরঞ্জাম, ট্র্যাকসাইড যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের মতো বিষয়ও রয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু প্রতি কিলোমিটারের হিসাব করলেই হবে না; দেশের রেলপথের অবকাঠামো, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, স্টেশন, লোকোমোটিভ, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার বর্তমান সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বাংলাদেশে কবচ ৪.০ বাস্তবায়নের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রয়োজন।
ভারতে ইতোমধ্যে কবচ ৪.০-এর ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারতীয় রেলওয়ের ২,৬৩৩ রুট কিলোমিটারে কবচ ৪.০ চালু হয়েছে এবং আরও ২১,৭৯৪ রুট কিলোমিটারে বাস্তবায়নের কাজ নেওয়া হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ ভারতের ইজ্জতনগর ডিভিশনের ৬৬০ রুট কিলোমিটারে কবচ ৪.০ স্থাপনের জন্য ২৯৫ কোটি ভারতীয় রুপি অনুমোদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রেলপথেও ধাপে ধাপে এ ধরনের আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি চালু করা হলে রেল যোগাযোগ আরও নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডোরগুলোতে পর্যায়ক্রমে আধুনিক ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই রেল নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এর সঙ্গে উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা, রেললাইন ও সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, চালকদের প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা এবং দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
রেলপথে একটি বড় দুর্ঘটনার মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনা করলে নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জননিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তাই ব্যয় বেশি হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের বাস্তবতা ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরীক্ষামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুটে ‘কবচ ৪.০’ বা সমমানের আধুনিক Automatic Train Protection ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সফলতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে তা দেশের অন্যান্য রেলপথে সম্প্রসারণ করা হলে যাত্রী নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।