নরসিংদীতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতায় যারা পথিকৃৎ
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জাতীয় সম্প্রচারে নরসিংদীর সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার অগ্রসেনারা
তালাত মাহামুদ | বিশেষ প্রতিনিধি, নরসিংদী
নরসিংদীর সাংবাদিকতার ইতিহাস দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি জেলার সংবাদকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতারও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অধ্যায়। বর্তমানের মতো যখন হাতে হাতে স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট কিংবা মুহূর্তের মধ্যে ছবি-ভিডিও পাঠানোর প্রযুক্তি ছিল না, তখন সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কয়েকজন সাংবাদিক নরসিংদীর সংবাদকে জাতীয় সম্প্রচারের পর্দায় তুলে ধরার পথ তৈরি করেছিলেন।
নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই সময়ের সাতজন সাংবাদিককে জেলার ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁরা হলেন—বাংলাদেশ টেলিভিশনে মো. নূরুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ে বদরুল আমিন চৌধুরী, এটিএন বাংলায় বেনজির আহমেদ বেনু, এনটিভিতে বিশ্বজিৎ সাহা, আরটিভিতে মো. মোর্শেদ শাহরিয়ার, চ্যানেল ওয়ানে মো. মোবারক হোসেন এবং বাংলাদেশ বেতারে আবদুর রহিম।
তাঁদের কর্মজীবনের সময়কাল ছিল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার এক ভিন্ন বাস্তবতা। বর্তমানে একটি স্মার্টফোন দিয়েই সংবাদ সংগ্রহ, ছবি ও ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো প্রান্তে পাঠানো সম্ভব। কিন্তু সেই সময়ে সংবাদ সংগ্রহ ও সম্প্রচারের জন্য প্রয়োজন হতো ক্যামেরা, ভিডিও ক্যাসেট, পরিবহন এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থার। একটি সংবাদ সময়মতো ঢাকায় পৌঁছে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় একটি ঘটনার সংবাদচিত্র ধারণের পর সেটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা ঘটলে সাংবাদিককে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে হতো। ক্যামেরায় ধারণ করতে হতো প্রয়োজনীয় দৃশ্য ও সাক্ষাৎকার। এরপর সেই ভিডিও ক্যাসেট ঢাকায় পাঠানোর জন্য খুঁজতে হতো দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংবাদ পাঠানোর সেই প্রক্রিয়া ছিল শ্রমসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ।
বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সংবাদদাতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নরসিংদীর বিভিন্ন ঘটনা, জনজীবনের সমস্যা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় সম্প্রচারে তুলে ধরার মাধ্যমে তাঁরা জেলার মানুষের কথা বৃহত্তর শ্রোতামহলের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
প্রতিকূলতার মধ্যেই তৈরি হয়েছিল নতুন দিগন্ত
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সেই প্রাথমিক সময়ে একজন জেলা সংবাদদাতার কাজ শুধু সংবাদ সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সংবাদটির গুরুত্ব যাচাই, নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সম্প্রচারকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তাঁদের পালন করতে হতো।
যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় একটি সংবাদ ঢাকায় পৌঁছাতেই দীর্ঘ সময় লেগে যেত। ফলে তাৎক্ষণিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জেলা সাংবাদিকদের দক্ষতা, যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই সময়ের সাংবাদিকদের এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই নরসিংদীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের নজরে আসতে শুরু করে। জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জাতীয় সম্প্রচারে স্থান পেতে থাকে।
পথিকৃৎদের পথ ধরে এগিয়েছে নতুন প্রজন্ম
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে গণমাধ্যমের কাঠামো ও প্রযুক্তি। এনালগ ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যাসেটের যুগ পেরিয়ে সাংবাদিকতা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেছে। মোবাইল সাংবাদিকতা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লাইভ সম্প্রচারের কারণে সংবাদ এখন মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির এই বিপ্লবের পেছনে যে প্রজন্মটি সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল, তাদের অবদান স্মরণ করা জরুরি। কারণ তাঁদের কর্মপ্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পথ তৈরি করেছে।
নরসিংদীর সেই সাত পথিকৃৎ সাংবাদিকের কর্মজীবনও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাংবাদিকতা থেকে বর্তমানে সরে এসে মো. নূরুল ইসলাম দৈনিক সমকালে কাজ করছেন। বেনজির আহমেদ বেনু এটিএন বাংলায়, বিশ্বজিৎ সাহা এনটিভিতে এবং মো. মোর্শেদ শাহরিয়ার আরটিভিতে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
অন্যদিকে, চ্যানেল আইয়ের সাবেক সাংবাদিক বদরুল আমিন চৌধুরী বর্তমানে চ্যানেল স্টার নিউজে এবং চ্যানেল ওয়ানের সাবেক সাংবাদিক মো. মোবারক হোসেন বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কর্মরত রয়েছেন।
তাঁদের কর্মস্থল পরিবর্তিত হলেও নরসিংদীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁদের অবদান ও পথচলার স্মৃতি আজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
স্মৃতিতে আবদুর রহিম
এই পথচলার অন্যতম নাম বাংলাদেশ বেতারের সাবেক প্রতিনিধি আবদুর রহিম। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। নরসিংদীর সংবাদকে বেতারের মাধ্যমে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর ভূমিকা স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর প্রয়াণে নরসিংদীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।
একটি সময়ের দলিল
নরসিংদীর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতার ইতিহাস কেবল কয়েকজন সাংবাদিকের কর্মজীবনের বিবরণ নয়; এটি একটি পরিবর্তনশীল গণমাধ্যম যুগের দলিল। সীমিত প্রযুক্তি, কঠিন যোগাযোগব্যবস্থা এবং সময়ের প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের কাজ করেছেন।
আজকের প্রজন্ম যখন প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সংবাদ প্রকাশ করতে পারে, তখন সেই পুরোনো দিনের সাংবাদিকতার শ্রম, ধৈর্য ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। তাঁদের হাত ধরেই নরসিংদীর ইলেকট্রনিক মিডিয়া সাংবাদিকতায় তৈরি হয়েছিল নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
নরসিংদীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁদের নাম তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—তাঁরা একটি পথচলার সূচনাকারী, একটি প্রজন্মের সাহস ও পেশাগত নিষ্ঠার প্রতীক।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সেই সাত পথিকৃৎ সাংবাদিকের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভকামনা। আর যাঁরা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।