কাজী আশরাফুল আলম
ঢাকা
ময়দা-তেল-চিনি থেকে প্যাকেজিং—সবকিছুর দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও শ্রমিক মজুরি
দেশের খাদ্যশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বেকারি শিল্প। ছোট, মাঝারি ও বড়—বিভিন্ন পর্যায়ের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু একের পর এক কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে দেশের বেকারি ব্যবসা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বেকারি পণ্য উৎপাদনের প্রধান উপকরণ ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, দুধসহ বিভিন্ন উপকরণের ব্যয় বেড়েছে। এর পাশাপাশি প্যাকেট ও পলিথিনজাত মোড়কসহ প্যাকেজিং সামগ্রীর দামও বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে এখন অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
শুধু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিই নয়, উৎপাদন ব্যবস্থার আরেকটি বড় চাপ হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা। বেকারি কারখানায় নিয়মিত উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি চালু ও বন্ধ করার কারণে বাড়তি ব্যয় তৈরি হয়। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে।
অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। কাঁচামাল, জ্বালানি, শ্রমিক, পরিবহন ও প্যাকেজিং—প্রতিটি খাতে ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সব ক্ষেত্রে সমান হারে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বেকারি পণ্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ হওয়ায় অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি করলে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিজেরাই বহন করছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বেকারি শিল্পের সঙ্গে শুধু মালিক নয়—কারখানার শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, কাঁচামাল সরবরাহকারী, প্যাকেজিং ব্যবসায়ী, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িত। তাই এই শিল্পে সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসার ওপরও পড়তে পারে।
এ অবস্থায় বেকারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাঁচামালের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ, সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কমানো না গেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী বেকারি শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে একদিকে যেমন উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়বেন, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও ভোক্তাদের জন্য পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই কাঁচামালের বাজার স্থিতিশীল করা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান এবং উৎপাদন খরচ কমাতে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ এখন বেকারি শিল্পের জন্য সময়ের দাবি।